টানা টানা চোখ। লাজুক হাসি আর ফিরে পাওয়া এক আকাশ স্বপ্ন। হাসপাতাল থেকে বাড়ির পথে গাড়িতে ক্যামেরার লেন্সে এভাবেই স্বকৃতজ্ঞতায় ধরা দিলো ১২ বছরের কিশোরী সামিয়া। নিষ্ঠুর দুনিয়ায় সামিয়ার বেঁচে থাকাটাই যেন অপার বিস্ময়! এক পুলিশ কর্মকর্তার মানবিকতায় মৃত্যু পথযাত্রী সামিয়া ফিরে পেয়েছে নতুন জীবন। এখন তার চোখে মুখে দুর্গম পথ চলার অদম্য প্রত্যয়। সব বাঁধা ডিঙিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত এক সম্ভাবনার হাতছানি। হাজারো স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার- সব মিলিয়ে সামিয়ার জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখার মতো হতবাক করার ঘটনায় এলাকাবাসীর অনেককেই ফেলে দিয়েছে ঘোরে আচ্ছন্নতায়।
সবার প্রশ্ন, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু পথযাত্রী কিশোরীর মৃত্যুই যেখানে অনিবার্য ছিলো সেখানে জীবন নিয়ে তার ফিরে আসাটা সত্যিই বিস্ময়ের। আর ঘোর কাটাতেই তাই দল বেঁধে অনেকেই এক নজরে সামিয়াকে দেখতে ছুটছিলেন তার বাড়িতে। এভাবেই গ্রামবাসীদের মুখে মুখে প্রশংসায় ভাসছিলেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান।
এলাকাবাসী জানান, ছিদ্র হৃৎপিণ্ড নিয়ে এই পৃথিবীতে আসা সামিয়া ক্রমেই হয়ে উঠেছিল তার পরিবারের বোঝা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদপিণ্ডের ভালভগুলোর কার্যকারিতা কমে আসায় ক্রমেই জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছিল এই কিশোরীর।
বিশেষ করে ফুসফুসের রক্তনালী সরুসহ ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, তীব্র চাপ,মাথা ঘোরা,হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের কারণে প্রায়শই অজ্ঞান হয়ে যেতেন সামিয়া। আর তখনই এই বুঝি মারা যায় - এমন আতঙ্কে মুষড়ে পড়তেন সামিয়ার গোটা পরিবার।
সামিয়ার বাবা শামীম হোসেন পোশাক শ্রমিক। মা রীমা আক্তার গৃহিণী। চার ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।
ধারকর্জ করে মেয়ের বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছিলেন বাবা। ২০১৯ সালেই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসরা। সংসার চালাতে যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে মেয়ের দুরারোগ্য ব্যাধির ব্যয়বহুল চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকাটাই ছিলো পরিবারের নিয়তি। আর তাই নিরুপায় হয়ে সব হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।
এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু পথযাত্রী সামিরার খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিষয়টি নজরে আসে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান ও তার স্ত্রী রিফাত জাহানের। বিসিএস ২৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা রাজশাহীর এসপি থেকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি যোগদান করেন ঢাকা জেলায়।
কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে ঢাকা জেলার (উত্তর) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) মো. গোলাম সরোয়ারের মাধ্যমে সামিয়াকে গত ২৩ জুন নেয়া হয় রাজধানীর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ৮ জুলাই তার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়।
অধ্যাপক ডা.মো শরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে মেডিকেল টিম দীর্ঘ সাত ঘণ্টার অস্ত্রপ্রচার শেষে অপারেশন থিয়েটারের বাইরে এসে যখন জানান, "অপারেশন সাকসেসফুল" তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন সামিরার বাবাসহ সেখানে উপস্থিত থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে মঙ্গলবার বাড়ি ফেরার পথে শামীম হোসেন জানান,নিরবে থেকেই চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করেন পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান দম্পতি। আবেগ আপ্লুত হয়ে তিনি জানান, খোদাতলা এমন মানুষকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন মানবতার দূত হিসেবে।
চোখের সামনে যেখানে আমরা মেয়ের মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম, সেখানে আজ তাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি- এটা যে আমাদের কাছে কতটা বিস্ময়ের তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
শামীম হোসেন জানান, "এসপি আনিসুজ্জামান দম্পতির এই মানবিকতার ঋণ আমরা কোনদিন ভুলবো না। প্রতিমুহূর্তে তিনি আমাদের খোঁজ খবর রাখতেন। মানসিকভাবে সব সময় সাহস দিতেন। বলতেন ইনশাল্লাহ। আল্লাহ চাইলে সামিরা আবার নতুন জীবন পাবে।
এ ছাড়াও অফিস শেষ করেই তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কাছে নিয়মিত ছুটে আসতেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) মোঃ গোলাম সরোয়ার। সার্বক্ষণিকভাবেই তিনি আমাদের খোঁজখবর রাখতেন।
এই ঘটনায় তারা প্রচারের আলোয় আসতে চান না উল্লেখ করে শামীম হোসেন জানান, আপনাদের কাছে এ তথ্য যা নিয়ে আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, নইলে মানবিকতার গল্পগুলো অনেকের কাছে অজানা রয়ে যাবে "
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সামিরা জানান, "আমি তো মরেই যেতাম। আল্লাহ তায়ালা এসপি সাহেবকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে বাঁচাতে। আমরা তার জন্য দোয়া করি। অপারেশন পরবর্তী সব ধরনের চিকিৎসা,ওষুধ,পথ্য ছাড়াও সামিরার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন পুলিশ সুপার ও তার স্ত্রী।
তিনি ও তার স্ত্রী আমাদেরকে সব সময় স্নেহ ও মমতায় ঘিরে রাখতেন। মনে হতো তারা যেন আমাদের কত্তো আপন। আত্মার আত্মীয়।"
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলার (উত্তর) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি আই) মোঃ গোলাম সরোয়ার জানান, "মেয়েটির চিকিৎসার পর্বে এসপি স্যার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। মারাত্মক অসুস্থতার মধ্যেও সামিরার নিয়মিতভাবে চিকিৎসা ও পরিচর্যার খোঁজখবর রেখেছেন।
চিকিৎসার সকল অর্থ ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছেন এবং কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন তা জানাতেও চান না কাউকে।
"আনিসুজ্জামান স্যার যা করেছেন গোপনীয়তার সঙ্গে করেছেন। তাঁর মানবিকতা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন এবং মানুষের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন। তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে।আড়ালেই থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পছন্দ করেন আনিসুজ্জামান স্যার। তাঁর এই মানবিক গুণাবলীর জন্য ফোর্সের সদস্যরা তাঁকে শ্রদ্ধা ও সমীহ করার পাশাপাশি তাঁর কাজের প্রশংসা করেন। যা আমাদের জন্য গৌরব এবং প্রেরণার" - যোগ করেন সামিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি আই) মো. গোলাম সরোয়ার।
কমেন্ট বক্স